বাঙ্গালির ইতিবৃত্ত : জাতি গঠনে
ইংরেজির caste, tribe, race, people, nation প্রভৃতি শব্দের মতো বিশিষ্ট অর্থে এখনও আমরা বিভিন্ন শব্দ আমাদের ভারতীয় ভাষাগুলিতে ব্যবহার করি না—এক ‘জাতি’ শব্দ দিয়ে আমরা এতগুলি বিভিন্ন অর্থের শব্দের কাজ বাঙ্গালা প্রভৃতি ভাষাতে চালাবার চেষ্টা করি। Nation অর্থে ‘রাষ্ট্র’ শব্দ চলতে পারে। People-এর জন্য ‘জনগণ’ বা ‘জন’। Caste-এর জন্য ‘বর্ণ’ শব্দ তো আছেই। Race-এর জন্য ‘জাতি’, Tribe-এর জন্য ‘উপজাতি’। আমাদের ভারতীয় রাষ্ট্রের মধ্যে-Indian Nation-এর মধ্যে, কতকগুলি বিশিষ্ট people বা ‘জন’-এর স্থান আছে। এক ভাষা ব্যবহার করা সমগ্র ভারতীয় রাষ্ট্রের বিশিষ্ট লক্ষণ নয়, যদিও ইংরেজি সংস্কৃত হিন্দি প্রভৃতির যোগে আমাদের একভাষিতার অভাবকে আমরা কার্যত পুরণ করে নিয়েছি। ভারতবর্ষে যে-বিভিন্ন people বা জনগণ বা জনসমূহ আছে, তাদের মধ্যে প্রথম এবং প্রধান লক্ষণ হচ্ছে তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা; আর সঙ্গে সঙ্গে, সেই ভাষাকে আশ্রয় করে, তাদের মানসিক Culture বা সংস্কৃতি, সেই ভাষা যার প্রকাশভূমি এমন তাদের জীবনযাত্রা রীতিনীতি সামাজিক পদ্ধতি। এক কথায়, ভারত-রাষ্ট্রের সঙ্গে কতকগুলি Language Culture Group অর্থাৎ বিশিষ্ট ভাষা ও সংস্কৃতি-যুক্ত কতকগুলি দল বা জনকে ধরতে হয়। এই সমস্ত দল বা জন হচ্ছে এক বৃহৎ বৃত্তের মধ্যে অবস্থিত কতকগুলি ছোটো ছোটো বৃত্ত। ভারতরাষ্ট্রের ভিতরে যে-সব people বা Language-Culture Group অথবা ভিন্ন ভিন্ন ভাষাবলম্বী জনসমূহ আছে, বাঙ্গালি জন—‘গৌড়-জন’ বলে মধুসূদন তাঁর মেঘনাদ বধ কাব্যে যার উল্লেখ করেছেন সেই ‘বাঙ্গালি’ বা ‘গৌড়জন’ একটি অন্যতম প্রধান দল বা শ্রেণি বা জন। বাঙ্গালির পাশে এইরূপ ‘অসমিয়া জন’ আছে, ‘ওড়িয়া জন’ আছে, ‘মৈথিল’, ‘মগহি’, ‘ভোজপুরিয়া’, ‘কোসলি’, ‘পছাঁহি’, ‘পূর্বী-পাঞ্জাবি’, ‘রাজস্থানি’, ‘গোরখালি’, ‘গাড়োয়ালি’, ‘কুমাউনি’, ‘গুজরাটি’, ‘সিন্ধি’, ‘কাশ্মীরি’, ‘মারাঠি’, ‘তেলেগু’, ‘তামিল’, ‘কানাড়ি’, ‘মালয়ালম’, ‘গোঁড়’, ‘ওরাওঁ’, ‘মুণ্ডা’, ‘সাঁওতালি’, ‘গারো’, ‘মণিপুরি’, ‘খাসিয়া’ প্রভৃতি নানা জনগণ আছে। পাঁচ ফুলের সাজির মতো এই-সব বিভিন্ন-ভাষাশ্রয়ী জন নিয়েই মিলিতভাবে ভারতীয় রাষ্ট্র। প্রথম 'বাঙ্গালি জনগণ' (বা সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে বাঙ্গালি 'জাতি') বলতে এমন এক শ্রেণির লোককে বুঝি, যারা রক্তে নানা জাতির মিশ্রণ হতে পারে, কিন্তু ভাষায় এক—যেহেতু তারা বাঙ্গালা ভাষা বলে। বাঙ্গালির মধ্যে—অর্থাৎ বঙ্গভাষী জনগণের মধ্যে বামুন, কায়েত, বদ্যি আছে, রাজপুত, ছত্রী, বৈশ্য আছে, যারা নিজেদের খাঁটি বা মিশ্র আর্য বলে মনে করে থাকে; আছে নানা অন্য জাতীয় ব্যক্তি যাদের উৎপত্তি হয়েছে দ্রাবিড় বা কোল অর্থাৎ নিষাদ থেকে, মোঙ্গোল অর্থাৎ কিরাত থেকে। ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, বাউরি, পশ্চিমি ছত্রী, চট্টগ্রামের চাকমা, উত্তর বাঙ্গালার রাজবংশী, পশ্চিম বাঙ্গালার মাহিষ্য, হিন্দুস্থান থেকে আগত পশ্চিমা মুসলমান, কত বিভিন্ন বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের মূল বংশগত উৎপত্তি পৃথক, তারা সকলেই বাঙ্গালি বা বঙ্গভাষী জাতির সামিল হয়ে গিয়েছে। বাঙ্গালা ভাষা নিয়েই বাঙ্গালি জাতি বা জনগণ। যত দিন না বাঙ্গালা ভাষা মিলছে তত দিন বাঙ্গালি জনের বা জাতির পাত্তাই নেই। “একদা যাহার বিজয় সেনানী হেলায় লঙ্কা করিল জয়”—বিজয়সিংহ বাঙ্গালা দেশ থেকে গিয়ে সিংহল জয় করেছিলেন, সেই বিজয়সিংহকে বাঙ্গালি জাতির মানুষ ভেবে আমরা আজ-কালকার বাঙ্গালিরা গর্ব করি। বিজয়সিংহ হয়তো ‘বঙ্গবাসী’ ছিলেন (এ-সম্বন্ধেও কিন্তু মতভেদ আছে), কিন্তু তাঁকে ‘বাঙ্গালি’ বলতে পারি না, কারণ তিনি ‘বঙ্গভাষী’ ছিলেন না, বাঙ্গালা ভাষার উদ্ভব বিজয়সিংহের সময়ে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ বছরের দিকে হয়-ইনি। মোটামুটি এইভাবে কথাটা বলা যায়। বাঙ্গালা ভাষার উৎপত্তির আগে বাঙ্গালা দেশে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মানব বংশের বা মূল জাতির লোক এসে বাস আরম্ভ করে দেয়। তাঁদের বংশগত উৎপত্তি ছিল আলাদা, মূল ভাষা ছিল আলাদা, ধর্ম সভ্যতা সংস্কৃতি রীতিনীতি রহন-সহন চাল-চলন সব আলাদা আলাদা ছিল। খ্রিস্টজন্মের কাছাকাছি সময়ে এদের নিজ নিজ পৃথক্ অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু খ্রিস্টজন্মের পরে, প্রায় হাজার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments